বিশ্ববাণিজ্যের বড় চ্যালেঞ্জগুলো বিদ্যমান থাকবে ২০২৬ সালেও

চারদিন পর বিদায় নিচ্ছে ২০২৫ সাল। বিদায়ী বছরটিতে বৈশ্বিক বাণিজ্য খাতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সরবরাহ চেইনের সংকট এবং দেশে দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি-সংক্রান্ত নানা চাপ।

চারদিন পর বিদায় নিচ্ছে ২০২৫ সাল। বিদায়ী বছরটিতে বৈশ্বিক বাণিজ্য খাতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সরবরাহ চেইনের সংকট এবং দেশে দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি-সংক্রান্ত নানা চাপ। তবে এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ২০২৫ সালে সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে আন্তর্জাতিক পণ্যবাণিজ্য। কনটেইনার পরিবহনেও দেখা যায়নি বড় ধরনের কোনো ধস। তবে আসন্ন ২০২৬ সালেও বাণিজ্য খাতে বিদায়ী ২০২৫ সালের চ্যালেঞ্জগুলো বহাল থাকবে বলে আশঙ্কা করছেন পর্যবেক্ষকরা। খবর দ্য স্ট্রেইটস টাইমস।

তাদের ভাষ্যমতে, স্থিতিশীলতার উল্টোপিঠে এসব চ্যালেঞ্জের কারণে আন্তর্জাতিক পণ্য ও সেবা আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে এরই মধ্যে কিছু কাঠামোগত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যথাযথ অর্থনৈতিক ও আর্থিক নীতির মাধ্যমে এগুলোকে মোকাবেলা না করা গেলে ২০২৬ সালে কাঠামোগত এসব ঝুঁকি সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বিপত্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্বব্যাপী পণ্য ও সেবা আমদানি-রফতানি কার্যক্রমকে অনেকটাই অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি। বৈশ্বিক বাণিজ্যপ্রবাহ ও বিভিন্ন দেশের মধ্যে ভূরাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনায় এরই মধ্যে শুল্ককে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রভাব পড়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালকে মূলত শুল্ক আরোপ ও চাপ তৈরির বছর হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, বৈশ্বিক জিডিপিতে শীর্ষ দুই অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মোট হিস্যা ৪৩ শতাংশেরও বেশি। দুই দেশের মধ্যে শুল্ক বিবাদ ও বাণিজ্য বিরোধ এবং মার্কিন শুল্কনীতির ফলে সৃষ্ট চাপের প্রভাব ২০২৬ সালে আরো স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হতে যাচ্ছে। বিশেষ করে শীর্ষ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি ব্যয় বাড়ার চাপ আরো প্রকট হয়ে পড়বে। এর প্রভাব পড়বে ভোক্তানির্ভর অর্থনীতির আওতাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সরবরাহ সিদ্ধান্ত ও বিনিয়োগ পরিকল্পনায়। একই সঙ্গে বাণিজ্যপথ পুনর্বিন্যাসের গতি আরো বাড়তে পারে।

আঞ্চলিক বাণিজ্যপ্রবাহে মার্কিন শুল্কনীতি ও এ-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তার প্রভাব এরই মধ্যে স্পষ্ট হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য আমদানির প্রবাহ কমেছে। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, লাতিন আমেরিকা ও ভারতের মতো অঞ্চলে আমদানি বেড়েছে। বিষয়টি উল্লেখ করে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, শুল্কনীতি ও বাণিজ্যপথ সংক্রান্ত সংকটের কারণে বৃহৎ বাজারগুলোর সংকোচন হলেও নতুন বাজারে চাহিদা তৈরি হচ্ছে।

বাজারের এ পুনর্বিন্যাস বৈশ্বিক বাণিজ্যকে স্থিতিশীল করার বদলে আরো জটিল করে তুলছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। কোম্পানিগুলোকে এখন একাধিক সরবরাহ চেইন ও বাজার একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে। এতে খরচ বাড়ছে, সঙ্গে ঝুঁকিও।

২০২৬ সালে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের চাপ আরো জোরালো হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। লোহিত সাগর এলাকায় হামলা কমে আসায় জাহাজ চলাচল ধীরে ধীরে আগের রুটে ফিরছে। এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে স্বল্প দূরত্বের এ রুট পুরোপুরি চালু হলে পণ্য পরিবহনে সময় কমে যাবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এতে বাজারে একসঙ্গে অতিরিক্ত পরিবহন সক্ষমতা ঢুকে পড়তে পারে। ফ্রান্সের কনটেইনার পরিবহন প্রতিষ্ঠান কম্পানি মেরিটাইম দ্যাফ্রেতমঁ-কম্পানি জেনেরাল মেরিটাইম (সিএমএ-সিজিএম) ও ডেনমার্কের জাহাজ পরিবহন প্রতিষ্ঠান এ.পি. মোলার-মার্স্ক এরই মধ্যে ওই রুটে জাহাজ চলাচল সীমিত করে এনেছে। কারণ লোহিত সাগরের রুটটিকে পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার করা শুরু হলে ইউরোপের বন্দরে জট তৈরির বড় ঝুঁকি রয়েছে।

একই সময় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি যদি প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পায়, তবে দেশটিতে আমদানির চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে। বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও সুদহার কমার প্রভাবে কোম্পানিগুলো মজুদ বাড়াতে চেষ্টা করবে। সে চাপ সামলানো পরিবহন খাতের জন্য কঠিন হতে পারে। এতে কভিড-১৯ মহামারীর প্রাদুর্ভাবের ধারাবাহিকতায় সৃষ্ট লজিস্টিকস সংকট আবার ফিরে আসার ঝুঁকি দেখতে পাচ্ছেন পর্যবেক্ষকরা।

বাণিজ্য চুক্তির দিক থেকেও পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক নয়। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার মধ্যে থাকা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ইউনাইটেড স্টেটস-মেক্সিকো-কানাডা এগ্রিমেন্ট (ইউএসএমসিএ) পুনর্মূল্যায়নের প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। ছয় বছরের মাথায় এ পর্যালোচনা নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। এক দেশের জন্য চুক্তির উন্নতি অন্য দেশের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের যেসব চুক্তি হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোয়ই প্রথাগত বাধ্যবাধকতার শর্ত যুক্ত করা নেই। ফলে রাজনৈতিক চাপ বাড়লেই এসব সমঝোতা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি থাকছে।

নীতিগত অনিশ্চয়তার আরেকটি বড় দিক যুক্তরাষ্ট্রের আদালত। মার্কিন প্রেসিডেন্টের আরোপ করা শুল্কের বৈধতা নিয়ে দেশটির সুপ্রিম কোর্টে যে মামলা ঝুলে আছে, তার রায় বাণিজ্য মহলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শুল্কনীতি অবৈধ ঘোষিত হলে আমদানিকারকদের দেয়া শুল্কের অর্থ ফেরত দিতে হবে কিনা, সে বিষয়ে প্রশ্ন উঠবে। আবার এ অর্থ ফেরতের বিষয়টি ঋণভারে জর্জরিত মার্কিন অর্থনীতিকে আরো চাপে ফেলে দিতে পারে। পাশাপাশি নতুন করে কীভাবে শুল্ক আরোপ করা হবে, তা নিয়েও তৈরি হবে অনিশ্চয়তা। এসব কারণে বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা আরো কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৫ সালের মতো ২০২৬ সালেও হয়তো বৈশ্বিক বাণিজ্যের সম্ভাব্য সংকটগুলোকে নানামুখী পদক্ষেপের মাধ্যমে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। তবে তার পরও বছরটি হবে উচ্চঝুঁকির। পরিবর্তন হবে দ্রুত আর পরিস্থিতি আগেভাগে অনুমান করা কঠিন হয়ে পড়বে। শুল্কনীতি, সরবরাহ চেইন, বাণিজ্য চুক্তি ও আইনগত অনিশ্চয়তা এ চার চাপ একসঙ্গে কাজ করবে। ফলে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

আরও